বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলোর কথা এখন মনে হলে মনে হয় আমরা কোনো বিভাগে ভর্তি হইনি, বরং এক অদৃশ্য দরজার ভেতর ঢুকে পড়েছিলাম। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলেন ময়ুখ স্যার।
স্যারের ক্লাসরুম কখনো ক্লাসরুম থাকতো না। দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে সরে গিয়ে কখনো শান্তিনিকেতনের মাঠ হয়ে যেতো, কখনো লঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্র, কখনো পুরোনো ইউরোপের কোনো ক্যাফে যেখানে দার্শনিকেরা রাত জেগে তর্ক করছে। আমরা বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হয়েও বেঞ্চ পেতাম না অন্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাও এসে বসে থাকতো। যেন খবর ছড়িয়ে গেছে আজ দুপুরে পৃথিবীটা অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হবে।
স্যার আসতেন হাতে বেনসন লাইট আর এক কাপ চা।
কিন্তু আশ্চর্য, কেউ কোনোদিন মনে করতে পারত না স্যার ক্লাসে সিগারেট খাচ্ছেন। মনে হতো সিগারেটটা আসলে একধরনের চক। ধোঁয়া দিয়ে তিনি বোর্ডে ছবি আঁকছেন। ধোঁয়ার সরু রেখা থেকে একসময় বেরিয়ে আসতেন রবীন্দ্রনাথ, তারপর ধীরে ধীরে মেঘনাদ তার রথ নিয়ে প্রবেশ করত। স্যার মাইকেল, রবীন্দ্রনাথের কথা বলতে বলতে হঠাৎ বাতাসে আঙুল চালিয়ে এমন সব রেখা আঁকতেন যে আমরা দেখতে পেতাম যুদ্ধের শব্দও কখনো কবিতা হতে পারে।
আর একটা বিষয় আজও ভুলতে পারি না, স্যার আমাদের কখনো ‘তুমি’ বলতেন না। সবসময় ‘আপনি’ করে সম্বোধন করতেন। প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগতো। মনে হতো শিক্ষক কেন ছাত্রদের এত সম্মান দেন? পরে বুঝেছিলাম, স্যার পাঠ দেওয়ার আগে মানুষকে মর্যাদা দিতে শেখাতেন। তাঁর “আপনি” সম্বোধনের ভেতরে অদ্ভুত এক বিশ্বাস ছিলো যেন আমরা এখনো হয়ে উঠিনি, কিন্তু হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে তিনি আগে থেকেই চিনে ফেলেছেন।
প্রথম ক্লাসেই স্যার বললেন,
“ভালো পাঠক হতে চাইলে আগে পৃথিবীর গল্প জানতে হবে।”
তারপর তিনি একের পর এক বইয়ের নাম বলতে লাগলেন। আরব্য রজনীর ইতিহাস, যাতকের গল্প, ঈশপের গল্প, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ছোটদের মহাভারত, ছোটদের রামায়ণ, নভেরা আহমেদ, সালভাদর ঢালি, বার্ট্রান্ড রাসেল ইত্যাদি আমরা খাতায় লিখছিলাম। কিন্তু পরে দেখি খাতায় বইয়ের নাম নেই। সেখানে আঁকা আছে মরুভূমি, শালগাছ, ঘোড়া, পাখি আর মানুষের চোখ।
স্যার বললেন, “কবিতা আর পদ্য এক না।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ।
ক্লাসরুমের জানালার বাইরে তখন বিকেলের আলো।
স্যার বললেন,
“ধরেন বিলের মাঝখান দিয়ে একটা শালুক ফুটে আছে। আপনার খুব নিতে ইচ্ছা করছে। আপনি কোমর পানি ভেঙে আগালেন। ফুলটা ধরতে যাবেন, ঠিক ওই সময় একটা সাপ পাশ কাটাইয়া চলে গেল। আপনি থমকে গেলেন। বুকের ভেতর কাঁপন উঠলো। এই যে শিহরণ– এইটাই কবিতা।”
কথা শেষ হতেই আমরা দেখলাম ক্লাসরুমে পানি উঠতে শুরু করেছে।
প্রথমে রুম ভিজলো। তারপর হাঁটু, তারপর কোমর।
কেউ ভয় পেল না।
আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম।
দেখলাম সত্যিই অনেক দূরে একটা শালুক ফুটে আছে।
আমরা পানির ভেতর হাঁটছি।
স্যার দাঁড়িয়ে আছেন তীরে। হাতে চায়ের কাপ। সিগারেটের ধোঁয়া উঠে গিয়ে আকাশে একটা দীর্ঘ কবিতার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
আমি শালুকের কাছে পৌঁছানোর আগেই একটা সাপ পাশ দিয়ে চলে গেল।
আমি ভয় পেলাম না।
শুধু বুঝলাম কিছু জিনিস হাতে পাওয়ার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য।
বহু বছর পরে মাস্টার্স শেষ করার দিন বিদায়ের সময় স্যার আমাকে ডাকলেন। কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা দিলেন না। শুধু ব্যাগের ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করে বললেন, “এইটা আপনার জন্য।”
দেখলাম সেটা একটা কবিতা।
আমি কিছু বলতে পারিনি।
কাগজটা হাতে নিতেই মনে হলো সেটার ভাঁজের ভেতর থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে। যেন বহুদিন আগের সেই ক্লাসরুম আবার খুলে গেছে। শব্দগুলো স্থির ছিল না: কখনো শালুক হয়ে ফুটছে, কখনো নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছে।
আমি কবিতাটা আজও সযত্নে তুলে রেখেছি।
কারণ বুঝেছি— বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হয়, ডিগ্রি শেষ হয়, ক্লাস শেষ হয়; কিন্তু কিছু শিক্ষক শেষ ক্লাসের পরও মানুষের ভেতরে পড়াতে থাকেন।
পেছনে তাকিয়ে দেখি স্যার আর নেই।
শুধু খোলা জানালা।
টেবিলের ওপর আধখাওয়া চা।
আর বোর্ডে ধোঁয়ার মতো লেখা কবি সুবোধ সরকারের ‘তুকারাম’ কবিতার অবিস্মরণীয় পঙক্তি:
“কবিতার পাণ্ডুলিপি জলে ফেলে দিলেই কবিতা ডুবে যায় না।”
লেখা: Hasnaine Isteafaz Pavel
সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।





















