✕
press2-header-icon1

কষ্ট

October 24, 2026

রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের অবরোধবাসিনীতে পর্দাপ্রথার অন্দরমহল

October 24, 2026

আল মাহমুদের ছোটগল্পে নর-নারীর সম্পর্ক ও দাম্পত্য সম্পর্ক

October 24, 2026

দিগন্ত টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লেখক আল মাহমুদ  বলেন-

“আমার জীবন হলো কবির জীবন। স্মৃতি-বিস্মৃতির জীবন। সব একটু একটু করে পাশ কাটিয়ে আমি বিস্মৃতি অতিক্রম করে চলে যাচ্ছি।”

লেখক আল মাহমুদ নিজেই তাঁর জীবনকে কবির জীবন বলে অভিহিত করেছেন। বাস্তবেও তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। যদিও তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং ছোটগল্পকার; তবুও কবিতা ছাড়া তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যান্য শাখার সঙ্গে সাধারণ পাঠকের পরিচয় তুলনামূলকভাবে কম।

এত কিছুর আড়ালেও আল মাহমুদকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ছোটগল্পকার হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়, কারণ ছোটগল্পে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু মূলত গ্রামীণ জীবন, নারী, নারীর সামাজিক অবস্থান, নর-নারীর সম্পর্ক এবং দাম্পত্যজীবনের নানা দিককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তিনি তাঁর গল্পে নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য, যৌনতা এবং নারীকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার সামাজিক প্রবণতাকে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই প্রবন্ধে আল মাহমুদের ছোটগল্পে নর-নারীর সম্পর্ক এবং দাম্পত্য সম্পর্ক কীভাবে চিত্রিত হয়েছে, তা আলোচনা করা হবে।

আল মাহমুদের ‘ছোট নৌকা’ গল্পে রাসু একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তার স্ত্রী সত্যবতীর সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল। একবার রাসু অন্যান্য জেলেদের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যায়। ফিরে এসে সে জানতে পারে, তার ফেরার চার দিন আগেই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে সত্যবতী মারা গেছেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর রাসু ছেলে দামোদরকে নিয়ে একাই জীবন কাটাতে থাকে। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কথা সে কখনো ভাবেনি। এতে বোঝা যায়, সত্যবতীর সঙ্গে তার দাম্পত্য সম্পর্ক গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে গল্পে নতুন মোড় আসে। সেখানে দাম্পত্য সম্পর্ককে অতিক্রম করে নর-নারীর জৈবিক আকর্ষণের বিষয়টি সামনে আসে। মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই এই আকর্ষণ বিদ্যমান। একে চাহিদা, ভোগকামনা বা লালসা—বিভিন্ন নামেই অভিহিত করা যায়।

রাসুর মতো তার ছেলে দামোদরও জেলে ছিল। একদিন সমুদ্রের ঝড়ে সে মারা যায়। এরপর দামোদরের স্ত্রী কালীকে তার পরিবারের লোকজন নিয়ে যায়। কিছুদিন পর কালী আবার রাসুর সামনে এসে দাঁড়ায়। রাসু তাকে ফিরিয়ে দেয় না; বরং পুত্রবধূ কালীর মধ্যেই সে নিজের মৃত স্ত্রী সত্যবতীর প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়। ঠিক এখানেই গল্পে জৈবিক চাহিদার বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে। লেখক অত্যন্ত শৈল্পিক ভঙ্গিতে এই মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন।

আল মাহমুদের ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’ গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পেই নর-নারীর জৈবিক আকর্ষণ ও দাম্পত্য সম্পর্কের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘মাংসের তোরণ’-এ ‘মাংসের তোরণ’ বলতে নারীর শরীরকে প্রতীকী অর্থে উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পের প্রধান চরিত্র আনজাম ও দিলারা। আনজামের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর আগে দিলারা বিবাহিত ছিল এবং তার একটি সন্তানও ছিল। কিন্তু কী কারণে সে আনজামের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তা গল্পে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এর পেছনে দাম্পত্য কলহ, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা সামাজিক বাস্তবতা—যেকোনো কারণ থাকতে পারে।

আনজাম ও দিলারার মধ্যকার আদিম আকর্ষণকে লেখক অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। আনজামের কাছে দিলারার পেটের প্রসবজনিত ফাটলের দাগ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা ধলেশ্বরী নদীর মতো মনে হয়। অথচ এই দাগ মাতৃত্বের স্মারক, যা সন্তান ধারণের অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য বহন করে। লেখক এভাবেই নারীর দেহকে শুধু কামনার বিষয় হিসেবে নয়, মাতৃত্বের প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপন করেছেন।

একই গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প ‘ভেজা কাফন’-এর প্রধান চরিত্র সাজ্জাদ ও নূরী। এই গল্পে নূরীর নারীর স্বাভাবিক মানসিকতা ও একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও নূরী সাজ্জাদের সঙ্গে সংসার শুরু করে। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল সুখের; কিন্তু সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নূরীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাদের সংসারের সমাপ্তি ঘটে।

গল্পটিতে আরও দেখা যায়, সাজ্জাদ নূরীকে তার পিতার সম্পত্তি বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য ভালোবাসেনি; বরং তার দেহ, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। নূরীর মৃত্যুর পরও তার দেহাবয়ব সাজ্জাদকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তবে নাকফুলটি না থাকায় মৃত নূরীকে তার কাছে যেন কিছুটা অপরিচিত মনে হয়। লেখক এই অনুভূতিকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

‘নীল নাকফুল’ গল্পে ওসমান ধান কাটার কাজে গিয়ে বানেছাকে বিয়ে করে। বানেছাও সেখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতা ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে ওসমান সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেনি। পরের বছর সে যখন বানেছাকে আনতে আসে, তখন তার জন্য নীল পাথর বসানো একটি নাকফুল নিয়ে আসে। কিন্তু এসে দেখে, বানেছা তখন অন্য একজনের স্ত্রী হয়ে গেছে। নিজের রূপ ও সামাজিক অসহায়ত্বের কারণে বানেছাকে কাশেমের সঙ্গে নতুন জীবন গড়তে বাধ্য হতে হয়। এই গল্পে দাম্পত্য সম্পর্কের ভঙ্গুরতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার নির্মম প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

‘খনন’ নামক ছোটগল্পে সুখানি কাজের সূত্রে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে অবস্থান করে। এর ফলে স্ত্রীর সঙ্গে তার দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সে অন্য এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। শুধু নিজের শারীরিক চাহিদা পূরণ করেই সে ওই নারীকে পরিত্যাগ করে চলে যায়। এমনকি চাকরির বদলি হলে নতুন কর্মস্থলেও অন্য কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চিন্তা তার মধ্যে কাজ করে। এই গল্পে লেখক পুরুষের ভোগবাদী মানসিকতা ও দাম্পত্য সম্পর্কে অবিশ্বস্ততার চিত্র তুলে ধরেছেন।

‘মীর বাড়ির কুরসিনামা’ গল্পে মোরগ-মুরগির আচরণের মাধ্যমে লেখক প্রতীকীভাবে দেখিয়েছেন যে, নর-নারীর মতো সমগ্র প্রাণিজগতের মধ্যেই জৈবিক চাহিদা একটি স্বাভাবিক ও সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি মানুষের জৈবিক আকাঙ্ক্ষাকে আরও গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, আল মাহমুদের প্রায় সব ছোটগল্পেই নর-নারীর সম্পর্ক, দাম্পত্য জীবন এবং এর অন্তর্নিহিত জৈবিক আকর্ষণের বহুমাত্রিক রূপ চিত্রিত হয়েছে। কোথাও দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আত্মত্যাগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার কোথাও জৈবিক চাহিদা সামাজিক ও নৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করেছে। মানবজীবনের এই জটিল বাস্তবতাকে তিনি শিল্পসম্মত ভাষা, প্রতীক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কখনো অশ্লীল ভাষার আশ্রয় নেননি; বরং শিল্পিত ভাষা, প্রতীক ও বাস্তবধর্মী চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে বিষয়গুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ কারণেই আল মাহমুদের ছোটগল্পে নর-নারীর সম্পর্ক ও দাম্পত্য জীবনের চিত্রায়ণ বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

আল মাহমুদ। সৌরভের কাছে পরাজিত।

আল মাহমুদ। ছোট নৌকা।

দিগন্ত টিভিতে প্রচারিত আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার।

আলেয়া আক্তার আঁখি

সহকারী গ্রন্থাগারিক

গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক কলেজ অব ফিজিওথেরাপি এন্ড হেল্থ সায়েন্স

নলাম,সাভার, ঢাকা।

Topics:

    The best option to stay updated

    for only
    $5.99
    annually
    Read next
    October 24, 2026

    রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের অবরোধবাসিনীতে পর্দাপ্রথার অন্দরমহল

    রত্না মাহমুদা পুরুষের আধিপত্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলার মহৎ মানবীর নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)।নারী পুরুষ ভেদাভেদ প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে।নারীকে নারী […]