রত্না মাহমুদা
পুরুষের আধিপত্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলার মহৎ মানবীর নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)।নারী পুরুষ ভেদাভেদ প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে।নারীকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবা জরুরি। নারী -পুরুষ বৈষম্য আধুনিক কালেও বর্তমান।পরাধীনতার শৃংখল ভেঙে নারী হবে মুক্ত স্বাধীন।প্রথিতযশা সাহিত্যিক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সমগ্রজীবন নারী অধিকার, নারী মুক্তির জন্য লড়ে গেছেন।সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও তিনি সাধারণ নারীদের জীবন যন্ত্রণার কথা লিখে গেছেন। পর্দা প্রথার নামে নারীদের কুক্ষিগত করে রাখা সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়ে বিপ্লবী আওয়াজ তুলেছেনে। মুসলমান নারী শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নিজে বিভিন্ন নারী প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন।হয়েছেন নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার। বিশেষ করে মুসলিম নারীজীবনের নিরবে সহ্য করা যন্ত্রণার তীব্র প্রতিবাদের শব্দ তলোয়ার সমাজপতিদের গলায় চালিয়েছেন!
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ‘অবরোধবাসিনী’ অন্যতম।প্রবন্ধ গ্রন্থের নিবেদন পাতায় তিনি লিখেন”কতকগুলি ঐতিহাসিক ও চাক্ষুষ সত্য ঘটনার হাসি -কান্না লইয়া অবরোধ -বাসিনী রচিত হইল”
তৎকালীন সমাজের নারীদের কঠের জীবন যাত্রার নিয়মকে খুব সূক্ষ্ম ভাবে তুলল এনেছেন।তিনি মুসলিম মহামানবী রাবেয়া বসরীর একটি বানী ব্যবহার করেছেন,’ইয়া আল্লাহ! যদি আমি দোজখের ভয়ে এবাদত করি, তবে আমাকে দোজখে নিক্ষেপ কর,আর যদি আমি বেহেশতের আশায় এবাদত করি তবে আমার জন্য বেহেশত হারাম হউক!”
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নিজেকে পাপী হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। কাঠমোল্লারা তাঁকে নাস্তিক বলে অপমান অত্যাচার করেছেন।
অবরোধ বাসিনীতে নারীরা অপরিচিত নারীদের দেখলে কীভাবে থাকতে হতো তাঁর কথা সুস্পষ্ট। অপরিচিত -শহরবাসিনী -মিশনারী নারীদের দেখলে ভয়ে ভেতর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিতো।নারীদের শুধু পুরুষের সামনে নই অপরিচিত নারীদের সামনে আসার কঠোর নিয়ম ছিলো।’যিনি যত বেশী পর্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশি পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশি শরীফ”
(অবরোধবাসিনী পৃঃ১৫)।উল্লেখিত বাক্যের মধ্যে বেগম রোকেয়ার ধর্ম বিরুদ্ধ কোনো প্রভাব নাই। কারণ তিনি ধর্মের সকল নিয়মকে সম্মান করতেন। নারীদের সহসনীয় জীবনের তাড়ানায় তাঁর বাক্যগুলো সমাজের প্রতি অজ্ঞ নারীদের সজ্ঞানকে উপলুব্ধ করতে সাহায্য করে।কারণ ইসলাম ধর্মে কোনো জায়গায় লেখা নাই নারী বেগানা নারীর সামনে যেতে পারবে না।পুরুষের সামনে গেলে নিশ্চয়ই পর্দার নিয়ম মেনে চলতে হবে। পাটনার এক বড়লোকের বিয়ে বাড়ির ঘটনা। এক মেহমান পাল্কীর ভেতর থেকে দেরি হওয়ায় বেয়ারাগণ ভেবেছে পাল্কী খালি।হাশমত বেগম ছয়মাসের প্ত্রু সহ পাল্কীতেই রয়ে গেলো।এদিকে অনুষ্ঠান শেষ খাওয়া দাওয়া শেষ! অথচ হাশমত বেগম সারারাত বাচ্চাসহ পাল্কীতে কাটিয়ে দিলো।পৌষ মাসের দীর্ঘ রাত শীতে কষ্ট করলেন।কোনো শব্দ করলেন না।কারণ বেয়ারাগণ পেছন থেকে শুনতে পেলে পাপ হবে।নারীর কণ্ঠ বেগানা পুরুষ শুনে ফেললে পাপ হবে!এমনকি ছমাসের শিশু বাচ্চাকে কাঁদতে দেননি। প্রাবন্ধিক যথার্থ বলেছেন,”কষ্ট সহ্য করিতে না পারিলে আর অবরোধ -বাসিনীর বাহাদুরি কী?পৃঃ১৭
তাহলে বর্তমান সময়ে চিৎকার চেঁচামেচি বদরাগী মেয়েগুলো তৎকালীন মুসলিম সমাজে জন্মালে আর বড় করে শব্দ করার সাহস পেতো না।নারীর শব্দ শোনানোর অধিকার ছিল না।সেখানে কী করে উচ্চস্বরে আওয়াজ করার অধিকার থাকতো।বর্তমান সময়ে মেয়েদের স্বাধীন জীবনযাপন-শিক্ষাগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার অবদান রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের।ঘর থেকে বের হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা,শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বামীর সমান উপার্জন করা।দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানো নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকতার অধিষ্ঠিত হওয়ার পুরো অবদান এই মহিয়সী নারীর।
বঙ্গের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সব মহিলারা একত্রে হজ পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন।স্টেশনের প্লাটফর্মে সব মহিলারা একত্রে বসে আছেন।তাঁদের গায়ের ওপর হাজী সাহেব মোটা একটা শতরঞ্জি দিয়ে ঢেকে দিলেন। কয়েকঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।ভাগ্যিস তাঁরা দম আটকে মরেনি।কারণ তাঁদের গলার স্বর কেউ শুনতে পারবে না। চুপচাপ বসে ছিলেন।ট্রেন আসলে ইংরেজ কর্মচারী হাজী সাহেবকে বললেন”মুন্সি! তোমারা আসবাব হিয়াসে হাটা লো।আভি ট্রেন আবেগা-প্লাটফরম পর খালি আদমি রহে গা-আসবাব নেহি রহে গা’।(পৃঃ১৮)হাজী সাহেব জবাবে বললেন,ঐ সব আসবাবপত্র নাহি আওরত হায়’।পৃঃ(১৮)মুসলিম
নারীদের অবস্থান কতটা ভয়াবহ ছিল।জনসমাগমে তাঁরা পন্য দ্রব্যের ব্যবহার করতো।পর্দার জন্যই তাঁদের জন্ম। ঘরের বাইরে তাঁরা নিস্তব্ধ-নিশ্চুপ-জীবনযাপন করবে!
এক বাড়িতে আগুন লাগলে বাড়ির গৃহকর্ত্রীর সমস্ত গয়না বাক্সে তুলে রাখলেন।বাড়ির দরজায় পুরুষ লোক দেখে আবার ভেতরে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকলেন।আগুনের সঙ্গে নিজে পুড়ে মরলেন তবুও ঘর থেকে বাইর হননি।”তদবস্থায় পুড়িয়া মরিলেন,কিন্তু পুরুষের সম্মুখে বাহির হইলেন না।ধন্য!কুল-কামিনীর অবরোধ! (পৃঃ২১)
নারী জীবনের চেয়ে পর্দার গুরুত্ব কতটুকু ছিলেন তা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন!
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কোনোদিন ইসলাম বিরোধী ছিলেন না।নারীবাদী ছিলেন না।বরং নারীদের ইহ জীবনের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন।মুসলিম নারী সমাজের পুরুষশাসিত সমাজের বিপক্ষে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।





















